দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচন এবং নানান সমীকরণ

Dewanganj municipal
দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভা ভবন।

প্রায় ২০ বর্গ কিলোমিটার আয়তন, ৫০০০০ এর অধিক জনসংখ্যা নিয়ে জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভা গঠিত।

দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার বর্তমান মেয়রের ৫ বছরের মেয়াদ শেষ হতে এখনো ৪ মাসের অধিক সময় বাকি। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে সারাদেশে মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া পৌরসভা গুলোর নির্বাচন সঠিক সময়ে হওয়া নিয়ে শংকা থাকলেও বসে নেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা। দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের প্রার্থীতা জানান দিচ্ছেন। তারা বিভিন্ন ব্যানার পোস্টারের মাধ্যমে এবং সামাজিক অনুষ্ঠান গুলোতে গিয়ে ভোটারদের সাথে তাদের মনের অভিপ্রায় এবং কুশল বিনিময় করছেন। দেওয়ানগঞ্জ এলাকার বাজার ঘাট গুলোর সর্বত্র এই আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।স্থানীয় নেতা কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ভোটাররাও তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছে।

- Advertisement -

মূলত আওয়ামী লীগের ৩ হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।

১৯৯৯ সালে তৎকালীন আওয়ামীলীগ শাসনামলে দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভা গঠিত হয়।

সর্বপ্রথম নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মরহুম আব্দুর রশীদ (দুলা), কিন্তু ২০০১ সালে বি,এন,পি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালিন স্থানীয় সাংসদ এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সাথে মতবিরোধের জেরে তিনি আর টিকতে পারেননি। তাকে সকল কাউন্সিলরদের অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে বহিষ্কার করা হয়। এর পর বহু বছর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দিয়ে পৌরসভার কার্যক্রম চলতে থাকে।

২০১১ সালে দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার ২য় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাড়িয়ে নির্বাচিত হন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ। সাড়ে তিন বছর মেয়র থাকার পর উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের নমিনেশন পেলে মেয়র পদটি ছেড়ে দেন। ফলে ২০১৪ সালের ৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মোহম্মদ নুরুন্নবী অপু আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে বাকি মেয়াদের জন্য মেয়র নির্বাচিত হন।

তখন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন চশমা প্রতীকের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শাহনেওয়াজ শাহানশাহ।

আবার ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নমিনেশন পান শাহনেওয়াজ শাহানশাহ।তিনি সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শেখ মোহম্মদ নুরুন্নবী অপু কে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন।

দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার বিগত নির্বাচন গুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায় এখানে বি,এন,পি তেমন বলার মতো কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে নাই। এখানে মূলত লড়াই হয় আওয়ামী লীগের প্রার্থী বনাম আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর ভেতর।

আরও একটি অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচিত মেয়রদের কেউই ৫ বছর মেয়াদের পুরো সময় টা মেয়র হিসেবে থাকতে পারেননি নানাবিধ কারনে। তবে বর্তমান মেয়র শাহনেওয়াজ শাহানশাহ যদি আর ৪ মাস অতিবাহিত করতে পারেন তবে তিনি হবেন এই পৌরসভার সম্পুর্ন মেয়াদ পালনকারী প্রথম মেয়র। এ থেকে সহজেই বুঝতে পারা যায় দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভা একটি কঠিন রাজনৈতিক সমীকরণের জায়গা।

আসন্ন পৌর নির্বাচন কে কেন্দ্র করে দেওয়ানগঞ্জে শক্তিশালী ৩ টি গ্রুপ বিদ্যমান। যারা সকলেই ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। এবং ভোটের মাঠেও এদের জনপ্রিয়তা খুবই কাছাকাছি। এদের তিন জনই ভিন্ন মেয়াদে পৌরসভার মেয়র ছিলেন। এবং তিন জনই কোন না কোন সময় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে পৌর নির্বাচন করেছেন। ফলে কেউই ছাড় দিতে নারাজ। তবে শেষ পর্যন্ত যে কোন দুই গ্রুপের সমঝোতায় আসার সম্ভাবনা কেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

কে করবে জয়লাভ ? কে হবে মেয়র ? কে বসবে সম্মানীয় ঐ চেয়ারে তার হিসাব নিকাশে ব্যস্ত এখন দেওয়ানগঞ্জ পৌরবাসী।

নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই সরগরম হয়ে উঠেছে দেওয়ানগঞ্জের রাজনীতি।

Dewanganj
সাবেক দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ।

মেয়র পদে আওয়ামী লীগের নমিনেশনের দৌড়ে এগিয়ে আছেন বলে মনে করা হয় দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদকে। তিনি প্রার্থী হবেন বলে ঘোষনা দিয়েছেন। পৌরবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তার বিভিন্ন পোস্টার এলাকায় শোভা পাচ্ছে। তিনি মেয়র থাকা কালিন সময়ে দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভা ৩য় শ্রেণী থেকে ২য় শ্রেণীর পৌরসভায় উন্নিত হয়।পৌরসভায় তাকে সব থেকে অভিজ্ঞ প্রার্থী হিসেবে ধরা হয়।কারন তিনি একাধারে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।তার সবথেকে বড় শক্তি হচ্ছে উপজেলা আওয়ামী লীগের পদধারী অধিকাংশ নেতাই তার অনুসারী হিসেবে পরিচিত এবং স্থানীয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতাদের নিয়ে রয়েছে তার বিশাল কর্মী বাহিনী। এছাড়াও জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে রয়েছে তার বিশেষ সক্ষতা। তবে তার আপন ছোট ভাই দেওয়ানগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুনুর রশিদ হারুনও মেয়র পদে লড়লে চাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে নিজের ঘরেই সমঝোতা না করতে পারলে আবুল কালাম আজাদের ভোটে ভাগ বসতে পারে।

Dewanganj
দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র নুরুন্নবী অপু।

দেওয়ানগঞ্জ পৌর নির্বাচনে আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী হচ্ছেন আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক উপ কমিটির সদস্য, সাবেক মেয়র শেখ মোহম্মদ নুরুন্নবী অপু। দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার অধিকাংশ নতুন প্রজন্মের তরুণ ভোটাররা তার প্রধান শক্তি। উপ নির্বাচনে ১৪ মাসের জন্য মেয়র হয়ে তিনি পৌর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেন। পৌর এলাকার সৌন্দর্য বর্ধন ও রাস্তা ঘাটের উন্নয়নে তার অবদান রয়েছে বলে মনে করে স্থানীয় জনগণ। তার প্রতি স্থানীয় সাংসদ আবুল কালাম আজাদের সুদৃষ্টি থাকলেও জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে রয়েছে তার দুরত্ব। এই দুরত্ব কাটিয়ে উঠতে পারলে তিনিও নৌকার মাঝি হতে পারেন।

Dewanganj
দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার বর্তমান মেয়র শাহ নেওয়াজ শাহেন শাহ।

দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার বর্তমান মেয়র হিসেবে আছেন শাহনেওয়াজ শাহানশাহ। তিনি নিম্নঅয়ের মানুষদের কাছে জনপ্রিয় একজন নেতা।তার একটি কিছু সুনির্দিষ্ট এলাকায় ভোট ব্যাংক রয়েছে। তিনি তার মেয়াদে শহরের বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা ঘাটের উন্নয়ন করেন।তিনি পৌরসভার রাস্তা গুলোতে জেনারেটরের মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্ন বিদুৎ এর ব্যাবস্থা করেন। স্থানীয় নানান সমস্যা সমাধানে সঠিক ও নায্য বিচারক হিসেবে তার সুনাম আছে।তবে তাকে সবসময় পৌরভবনে না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সামগ্রিক বিবেচনায় তিনি আবারো নৌকার মনোনয়ন পেয়ে যেতে পারেন।

অপরদিকে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে সে ভাবে কারও নাম এখনো শোনা যাচ্ছে না। তবে তরুণ কাউকে নমিনেশন দিয়ে চমক দেখাতে পারে বি,এন,পি।

তবে দলীয় প্রতীকের বাইরেও ব্যক্তি ইমেজ জয়-পরাজয়ের বড় ফ্যাক্টর বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সাধারণ ভোটাররা।

দেওয়ানগঞ্জ পৌর নির্বাচনের সম্ভাব্য এই তিন হেভিওয়েট প্রার্থীর নামেই বেশ কিছু মামলা রয়েছে। জামিন স্থগিত কিংবা মামলা পুনরায় চালু হলে যে কারো প্রার্থীতা ঝুলে যেতে পারে।

তবে দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার সাধারণ ভোটাররা বলছেন সন্ত্রাস, মাদক মুক্ত ও উন্নয়নশীল আধুনিক নগর গড়ার ব্যাপারে তারা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিবেন।

আপনার মতামত দিন